সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যে জিম্মি চট্টগ্রাম এলজিইডি: উন্নয়নে হরিলুট
বিশেষ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী দুর্নীতি ও কমিশন সিন্ডিকেট। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, রাস্তাঘাট ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ এখন ওপেন সিক্রেট। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ধারাবাহিক অভিযান এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে এই ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের যোগসাজশে চলমান "পার্সেন্টেজ" বা কমিশন বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
১. ‘নগদ ৩% অগ্রিম’ ও টেবিল ভিত্তিক কমিশন বাণিজ্য
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম এলজিইডি ভবনে যেকোনো উন্নয়নমূলক কাজের বিল ছাড় করাতে হলে গুনতে হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন। একাধিক ভুক্তভোগী ঠিকাদারের অভিযোগ, উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে জেলা ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর টেবিল পর্যন্ত ফাইল পৌঁছানোর আগেই নির্ধারিত কমিশন নগদে বুঝিয়ে দিতে হয়।
• হিসাব রক্ষকের দাপট: সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে জেলা কার্যালয়ের হিসাব রক্ষণ শাখার বিরুদ্ধে। যেকোনো চুরান্ত বা আংশিক বিল পাস করার ক্ষেত্রে মোট বরাদ্দের ৩ শতাংশ অগ্রিম কমিশন দাবি করা হয়। এই টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয় অথবা ফাইলে নানা অহেতুক ত্রুটি ধরা হয়।
• সাইট ভিজিটের নামে বকশিশ: প্রকল্প পরিদর্শনের নামে মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীরা সাইট প্রতি ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।
২. হাঠহাজারী, কর্ণফুলী ও আনোয়ারায় অর্থ আত্মসাৎ
সম্প্রতি (মার্চ ২০২৬) দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম চট্টগ্রাম এলজিইডি ভবনে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। দুদকের প্রাথমিক তদন্তে চট্টগ্রামের হাটহাজারী, কর্ণফুলী এবং আনোয়ারা উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। এই তিন উপজেলার একাধিক প্রকল্পের নথিপত্র এবং মাস্টার রোল জালিয়াতির প্রমাণ খতিয়ে দেখছে দুদক।
৩. বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন প্রকল্প (B-Strong) ও উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্য
বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন সংক্রান্ত ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকার "বি-স্ট্রং" (B-Strong) প্রকল্পের অধীনে চট্টগ্রাম বিভাগের ছয়টি জেলায় যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তার প্রাক্কলন (Estimates) তৈরিতেই বড় ধরনের দুর্নীতির জাল বিছানো হয়েছে।
• ল্যাপটপ ও কম্পিউটার ক্রয়ে হরিলুট: এই প্রকল্পের অধীনে মাত্র ৪টি ল্যাপটপ কেনার জন্য মোট ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
• অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয়: বন্যা-পরবর্তী জরুরি পুনর্বাসনে কোনো প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও প্রতিটি স্ট্রিট সোলার লাইটের মূল্য ধরা হয়েছে ৭২ হাজার টাকা। সরকারের পরিকল্পনা কমিশন ও দুদকের অনুসন্ধানে এই ব্যয়কে চরম "অস্বাভাবিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত" হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৪. নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও টেকসইহীন উন্নয়ন
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় এলজিইডির সড়ক কার্পেটিং ও সংস্কার কাজে নিম্নমানের ইটের খোয়া, বালুর পরিবর্তে কাদা-মাটি এবং যৎসামান্য বিটুমিন ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ঠিকাদারদের বক্তব্য, বিল তোলার জন্য শুরুতেই বড় অঙ্কের টাকা ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়ায় তারা কাজের গুণগত মান বজায় রাখতে পারেন না। ফলে সরকারের শত শত কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা রাস্তা এক বর্ষা পার হতেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।
৫. কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি
কমিশন বাণিজ্য ও ফাইল আটকে ঘুষ নেওয়ার বিষয়ে চট্টগ্রাম এলজিইডি ভবনের অভিযুক্ত হিসাব রক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তাদের এখানে কোনো ফাইল পেন্ডিং নেই এবং কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। তবে দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপ-পরিচালক জানিয়েছেন, সংগৃহীত নথিপত্র ও প্রকৌশলীদের বয়ান যাচাই-বাছাই করে দ্রুতই কমিশনে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
সম্পাদকীয় মন্তব্য: গ্রামীণ ও টেকসই সড়ক যোগাযোগের মেরুদণ্ড হলো এলজিইডি। কিন্তু চট্টগ্রামের এলজিইডি ভবনের ভেতরের এই রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দুর্নীতি ও টেবিল-বাণিজ্য বন্ধ না হলে সরকারের শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প ভেস্তে যাবে। এই সিন্ডিকেট ভেঙে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Crime Times
Crime Times